Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Responsive Advertisement

অপারেশন সার্চলাইট: বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত ও ধ্বংসের সূচনা

 অপারেশন সার্চলাইট: বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত ও গণহত্যার সূচনা

ঢাকা, বাংলাদেশ: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যরাত ছুঁই ছুঁই। বসন্তের বাতাস ছাপিয়ে ঢাকার আকাশে তখন বারুদের গন্ধ। ঘুমন্ত নগরীর বুকে নেমে এল পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের এক সুপরিকল্পিত ও নৃশংস আঘাত, যার কোডনেম ছিল 'অপারেশন সার্চলাইট'। এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না; এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম গণহত্যার সূচনা।

Written By Avijit Bose 





                                                     নৃশংসতার নীল নকশা : ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে তারা গোপনে সামরিক প্রস্তুতির ছক কষতে থাকে। জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং 'বাংলার কসাই' খ্যাত জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে চূড়ান্ত করা হয় এই বর্বর অভিযানের পরিকল্পনা।

তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল—বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। এজন্য তারা টার্গেট করে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা এবং সশস্ত্র বাহিনীতে থাকা বাঙালি সদস্যদের।

ক্যাপশন: অপারেশন সার্চলাইটের পূর্বপ্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা (প্রতীকী চিত্র)।

রক্তাক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

২৫শে মার্চ রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হওয়ার সাথে সাথেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক, কামান ও ভারী মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যা ছিল সকল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু।

ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল এবং রোকেয়া হলে চালানো হয় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় আবাসিক ভবনগুলোতে। সেই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক ও কর্মচারীকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিক্ষার পবিত্র অঙ্গন মুহূর্তেই পরিণত হয় বধ্যভূমিতে।

 ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ।

প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ

একই সময়ে আক্রমণ চালানো হয় পিলখানার ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদর দপ্তর এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে। তবে এখানে পাকিস্তানি বাহিনী কিছুটা প্রতিরোধের মুখে পড়ে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা তাদের সাধারণ থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়েই আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরোচিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ। যদিও ভারী অস্ত্রের মুখে সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি, কিন্তু তা বাঙালির সাহস ও সংকল্পের প্রতীক হয়ে ওঠে।

পাকিস্তান বাহিনীর তীব্র আক্রমণের শিকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স।

নেতৃত্বকে আঘাত ও পরবর্তী অধ্যায়

এই অভিযানের আরেকটি মূল অংশ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

পুরান ঢাকা, শাঁখারীবাজারসহ বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে চালানো হয় পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ। সেই এক রাতেই ঢাকা শহরে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়।


'অপারেশন সার্চলাইট' ছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বুটের তলায় পিষে ফেলার এক ঘৃণ্য প্রয়াস। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যা ভেবেছিল, ঘটেছে তার বিপরীত। এই বিভীষিকাময় রাতের নৃশংসতাই বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য ঐক্যবদ্ধ করে। ২৫শে মার্চের সেই কালরাত পেরিয়ে রক্তক্ষয়ী নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। অপারেশন সার্চলাইট তাই ইতিহাসে কেবল এক বেদনাবিধুর স্মৃতি নয়, বরং শোষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণাও।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ