Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Responsive Advertisement

ভারতীয় থিয়েটার আর্টটিস থেকে পাকিস্তান এর সেনাবাহিনীর মেজার

 টাইগার রবীন্দ্র কৌশিক: যে গুপ্তচর নিজের পরিচয় বিসর্জন দিয়ে ইতিহাসে অমর হলেন


ইতিহাস সাধারণত বিজয়ীদের কথা বলে। কিন্তু ইতিহাসের আড়ালে থেকে যাওয়া কিছু মানুষের গল্প থাকে, যাঁদের অবদান বিজয়ের থেকেও গভীর। ভারতের গুপ্তচর ইতিহাসে এমনই এক বিস্মৃত নায়ক হলেন রবীন্দ্র কৌশিক, যিনি ‘ব্ল্যাক টাইগার’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবন কেবল গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনি নয়—এ এক চরম আত্মত্যাগের দলিল।

লেখক: অভিজিৎ বোস| বিশেষ প্রতিবেদনে 






১৯৫২ সালে রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে জন্ম রবীন্দ্র কৌশিকের। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সংবেদনশীল ও সৃজনশীল। কলেজজীবনে নাট্যচর্চায় তাঁর অভিনয় ক্ষমতা সকলকে মুগ্ধ করত। মঞ্চে চরিত্রে মিশে যাওয়ার সেই দক্ষতাই একসময় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ভারতের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার’ (RAW) বুঝে যায়—এই তরুণের মধ্যেই রয়েছে এক নিখুঁত গুপ্তচর হওয়ার সম্ভাবনা।


দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পর রবীন্দ্রকে পাঠানো হয় পাকিস্তানে। সেই যাত্রা ছিল একমুখী—যেখানে ফেরার নিশ্চয়তা ছিল না। নিজের নাম, পরিবার, ধর্ম, পরিচয়—সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি নতুন জীবন গ্রহণ করেন। নতুন নাম নবী আহমেদ শাকির, নতুন ধর্ম ইসলাম, নতুন দেশ পাকিস্তান। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে তিনি ছিলেন একজন ভারতীয়ই।


পাকিস্তানের সমাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মানিয়ে নেন রবীন্দ্র। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে Law College থেকে এবং Pakistan Army যোগ দেন আর ধীরে ধীরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছান। সেখান থেকেই প্রায় নয় বছর ধরে তিনি ভারতের জন্য পাঠাতে থাকেন অতি গোপন ও মূল্যবান সামরিক তথ্য। বলা হয়, সেই সময় ভারতের বহু কৌশলগত সিদ্ধান্তে ‘ব্ল্যাক টাইগার’-এর পাঠানো তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

Imporpant: Pakistan Army উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মেয়ে এর সাথে বিয়ে করেন এবং একটি মেয়ে হয় তাদের 

তবে গুপ্তচরের জীবন কখনও নিরাপদ নয়। ১৯৮৩ সালে এক বিশ্বাসঘাতকতার ফলে ফাঁস হয়ে যায় রবীন্দ্র কৌশিকের পরিচয়। তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা। শুরু হয় এক দীর্ঘ ও নির্মম অধ্যায়। বিভিন্ন জেলে তাঁকে আটক রাখা হয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, একাকীত্ব এবং অবহেলার মধ্যেই কাটতে থাকে তাঁর দিন।


কারাবন্দি অবস্থায় রবীন্দ্র কৌশিক মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। যক্ষ্মা, হৃদরোগসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এত কষ্টের মধ্যেও তিনি নিজের দেশের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি—এটাই তাঁর নীরব বীরত্ব।


২০০১ সালে করাচির এক জেলে নিঃশব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই ভারতীয় গুপ্তচর। তাঁর মৃত্যুর খবরও দীর্ঘদিন অজানা ছিল। যিনি দেশের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিলেন, তিনি জীবদ্দশায় পেলেন না কোনও সরকারি স্বীকৃতি বা সম্মান। তাঁর পরিবারও বছরের পর বছর অবহেলার শিকার হয়েছে।


সাম্প্রতিক সময়ে বই, গবেষণা ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্র কৌশিকের কাহিনি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মানুষ জানতে শুরু করেছে এক এমন মানুষের গল্প, যিনি দেশের জন্য নিজের অস্তিত্ব পর্যন্ত মুছে ফেলেছিলেন।


রবীন্দ্র কৌশিক আমাদের শেখান—দেশপ্রেম মানে কেবল সীমান্তে বন্দুক হাতে লড়াই নয়। কখনও কখনও নিঃশব্দে, অন্ধকারে দাঁড়িয়েও দেশকে রক্ষা করা যায়। ‘ব্ল্যাক টাইগার’ সেই নীরব যোদ্ধার প্রতীক, যিনি ইতিহাসের শিরোনামে না থেকেও ইতিহাসকে বদলে দিয়েছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ